উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
নিজস্ব প্রতিনিধি : ||
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার যমুনা নদীর আলোকদিয়া চর এলাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ৭ ও ৮ নম্বর টাওয়ারসংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি,প্রশাসনের নাকের ডগায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার (সেকশন কাটার) ব্যবহার করে দিন-রাত নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন ও শতাধিক বাল্কহেডে পরিবহন করা হলেও কার্যকর অভিযান বা দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, হাজার হাজার বিঘা আবাদি জমি এবং কয়েক হাজার মানুষের বসতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।শুক্রবার (৩ জুলাই ২৬ ইং) সরেজমিনে আলোকদিয়া চরসহ যমুনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৯টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজারের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু প্রায় ১৫০টি বাল্কহেডে লোড করে বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে ড্রেজার ও বাল্কহেডের নিরাপত্তায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি অবস্থান করছেন বলেও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, একটি প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ী চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রায় এক মাস ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, এই কার্যক্রমের ফলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের গুরুত্বপূর্ণ টাওয়ার,শত শত বসতবাড়ি, কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীভাঙনের উচ্চ ঝুঁকিতে পড়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত (১১ জুন ২৬ ইং) তারিখে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়। পরবর্তীতে ২০ জুন এলাকাবাসী মানববন্ধন করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান। এছাড়া ১ জুলাই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করে। ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও অভিযোগ অনুযায়ী এখনো অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে নৌপুলিশ বা কোস্ট গার্ডকে জানানো হলে অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযোগকারীদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন।এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, “এর আগে আমার নেতৃত্বে ২৫টিরও বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। জুন মাস সরকারি অর্থবছরের সমাপনী মাস হওয়ায় এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পাটুরিয়া নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”তবে সরেজমিনে স্থানীয়দের দাবি, নির্দেশনার কথা বলা হলেও ঘটনাস্থলে নৌপুলিশ বা কোস্ট গার্ডের কোনো দৃশ্যমান অভিযান বা কার্যকর তৎপরতা দেখা যায়নি।আইন যা বলছে,বিশেষজ্ঞদের মতে,অনুমোদন ব্যতীত নদীর তলদেশ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী—সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ও ইজারা প্রদানকৃত বালুমহাল ব্যতীত অন্য কোনো স্থান থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নদীর তীর, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো কিংবা জনবসতির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়—এমন এলাকায় ড্রেজার বা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, অবৈধ ড্রেজার, বাল্কহেড ও যন্ত্রপাতি জব্দসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো, নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দণ্ডবিধি, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায়ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।পরিবেশ ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে,নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বা অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করলে নদীভাঙন ত্বরান্বিত হয়, তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধসে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।এদিকে এলাকাবাসীর দাবি, জনস্বার্থে অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, জড়িতদের আইনের আওতায় আনা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি অভিযান পরিচালনা এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ারসহ জনবসতি ও কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।