সোহরাওয়ার্দীঃ করোনা-প্রকোপ পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ের শিখন

ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে বিষয়বস্তু হ্রাস করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও

পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির সার্বিক নির্দেশনা ও

পরামর্শক্রমে রুম টু রিড যৌথভাবে ‘করোনা মহামারীতে শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতি পূরণ:

বাংলা বিষয়ের শিখনফল পর্যালোচনা এবং বিষয়বস্তু নির্ধারণ’ বিষয়ক একটি গবেষণা

পরিচালিত করে। গবেষণার উদ্দেশ্য হলো, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা বিষয়ের

শিখন-ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে শ্রেণিভিত্তিক অর্জন-উপযোগী যোগ্যতা বিশ্লেষণ করে

অগ্রাধিকারমূলক যোগ্যতাসমূহ নিরূপণ এবং তদ্ধসঢ়;সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তু নির্ধারণ। সেই সাথে

বাংলা বিষয়ের জন্য রিমেডিয়াল প্যাকেজ তৈরি করা যাতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় পুনরায় খোলার পরে

অবশিষ্ট কার্যদিবসে শ্রেণিভিত্তিক অর্জন-উপযোগী যোগ্যতাসমূহ অর্জন করতে পারে।

উক্ত গবেষণাটির মোড়ক উন্মোচন, গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল প্রকাশ ও সুপারিশমালা উপস্থাপনের

জন্য গতকাল ২৮ অক্টোবর রাত ৮টায় একটি ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করা হয় যা রুম টু রিড

বাংলাদেশের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান

অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম, মহাপরিচালক

(গ্রেড ১), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন

জনাব মোঃ শাহ্ধসঢ়; আলম, মহাপরিচালক, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (নেপ) এবং প্রফেসর

জনাব নারায়ন চন্দ্র সাহা, চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন জনাব রাখী সরকার, কান্ট্রি ডিরেক্টর, রুম টু রিড বাংলাদেশ।

এছাড়াও, সম্মেলনে যোগদান করেন জাতীয় ও মাঠ পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তাবৃন্দ,

শিক্ষানুরাগি এবং আন্তর্জাতিক/জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং রুম টু রিড

বাংলাদেশ এর কার্যক্রম পরিচালিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দ।

গবেষণাপত্রটি উপস্থাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী

অধ্যাপক জনাব শাহ্ধসঢ়; শামীম আহমেদ। শিক্ষাμম ও পাঠ্যপুস্তকসমূহ পর্যালোচনা এবং

মাঠপর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত্বের ভিত্তিতে গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের যথার্থতা নিশ্চিত করা হয়েছে।

দেখা যায়, করোনা-প্রকোপ পরবর্তী সময়ে শ্রেণিভিত্তিক বাংলা বিষয়ে অগ্রাধিকারমূলক

শিখনফলের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ‘শোনা’, ‘বলা’, ‘পড়া’ ও

‘লেখা’Ñ ভাষাদক্ষতার এই চারটি ক্ষেত্রে শুধু ‘অবশ্যই শিখনীয়’ (গঁংঃ ষবধৎহ) হিসেবে নির্ধারিত

শ্রেণিভিত্তিক অর্জন-উপযোগী যোগ্যতাসমূহকে গবেষণা প্রতিবেদনে শ্রেণিভিত্তিক

উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত্বের ভিত্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ

সুপারিশমালা প্রস্তাব করা হয়:

১. ‘শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক পাঠদান’ এবং ‘অভিভাবকের সহায়তায় শিক্ষার্থীর বাড়ির কাজ’-এর

সমন্বয়ে একটি মিশ্র-মডেল অনুসরণ করে রিমেডিয়াল পরিকল্পনা প্রণয়ন;

২. বিদ্যালয়ে শিখন-শেখানোর পাশাপাশি বাড়িতে চর্চায় সহায়তা করার জন্য সহায়ক শিক্ষা

উপকরণ (ওয়ার্কশিট) সরবরাহের ব্যবস্থা;

৩. প্রাপ্ত সময়ের ভিত্তিতে নির্বাচিত পাঠের বাইরে থাকা অত্যাবশ্যকীয় ভাষা-দক্ষতাগুলো (যেমন

যুক্তবর্ণ, ব্যাকরণ ইত্যাদি) সমন্বয় করে একটি দ্রুততম সময়ে শিখন পরিকল্পনা প্রণয়ন;

৪. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সীমিত সময়ে নির্বাচিত বিষয়বস্তু থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ

পাঠগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শেখানো;


৫. করোনা-প্রকোপ পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মনোসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে

বিদ্যালয়ের পাঠকে আনন্দদায়ক করতে শিশুতোষ পঠন কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা

রাখা;

৬. শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যালয়মুখী করতে প্রচারণা

চালানো, ও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

গ্রহণ;

৭. করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত শেখানো বিষয়ের উপর পুনরালোচনার ব্যবস্থা

রাখা;

৮. ধারাবাহিক/চলমান মূল্যায়নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীকে প্রদত্ত কাজ সম্পাদনে উৎসাহ প্রদান এবং

যথাযথ ফিডব্যাক প্রদানের মাধ্যমে প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনে সহায়তা করতে সচেষ্ট থাকা;

এবং

৯. বিদ্যালয়ে পরিচালিত শিখন-শেখানো কার্যক্রম নিয়মিত তত্ত্বাবধান করা এবং শিক্ষকদের

প্রয়োজনীয় পেশাগত সহায়তা প্রদান করা।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির উর্দ্ধতন বিশেষজ্ঞ জনাব মোহাম্মদ আহসান ইবনে মাসুদ

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য রিমেডিয়াল প্যাকেজের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ

উপকরণসমূহ উন্নয়ন করার কথা বলেছেন যেমন: ১. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষকদের জন্য শিক্ষণ

নির্দেশিকা; ২. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়ার্কশিট; ৩. প্রথম ও দ্বিতীয়

শ্রেণির শিক্ষকদের জন্য পেশাগত বিকাশ ম্যানুয়াল/স্ব-ওরিয়েন্টেশন ম্যানুয়াল; ৪. সামাজিক ও

আবেগিক শিখন, রিমেডিয়াল প্যাকেজে/ওয়ার্কশিটে অন্তর্ভূক্তকরণ।

ভার্চুয়াল সম্মেলনের অতিথি জনাব আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম, মহাপরিচালক (গ্রেড ১),

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) তার বক্তব্যে বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হবার সাথে সাথেই

আমরা টিভিতে ‘ঘরে বসে শিখি’ কার্যক্রম শুরু করেছি। আমার পরবর্তীতে একটি সফটওয়্যার

মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে ১০০% শিক্ষার্থীদের উপর একটি জরিপ চালাই এবং জরিপে দেখা যায় ৪৯%

থেকে ৫৫% শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে ক্যাবল টিভি দেখার সুবিধা আছে এবং ৯১-৯৮% পর্যন্ত

শিক্ষার্থীদের আমরা মোবাইল বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে পৌছাতে পারছি। যারা টিভি দেখতে

পারছে না আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকতারা তাদের সাথে ফোন পড়াশুনার বিষয়ে কথা বলছেন।”

তিনি বলেন, “করোনা পরবর্তী সামনের দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণেএই

রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি দিক নির্দেশনা দিবে। আমরা ওয়েবসাইটে রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি

প্রকাশ ও মুদ্রিত অনুুলিপি বিতরণ করার জন্য খুব দ্রুত কাজ শুরু করবো। আমরা স্কুল খোলার প্রথম ২

মাস শিখন ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে কাজ করব তারপর শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষাক্রম অনুযায়ী নিয়মিত

ক্লাস শুরু করব।” তাছাড়াও তিনি জানান, দূরবর্তী শিখন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার আরো

প্রজেক্ট গ্রহণ করছেন।

প্রফেসর জনাব নারায়ন চন্দ্র সাহা, চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

(এনসিটিবি) তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা যেহেতু অনলাইন সুবিধাগুলো সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের

কাছে পৌঁছে দিতে পারছি না তাই শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে ও শিক্ষার্থীদের

মাঝে বৈষম্য তৈরী হচ্ছে। এই ঘাটতি দূর করার জন্য পরবর্তী শ্রেণীতে যে বিষয়বস্তু আছে তার

সাথে এই রিমেডিয়াল প্যাকেজটি বাস্তবায়ন করার জন্য যুক্ত করতে হবে। সেইসাথে আমরা যে

শিখন শেখানোর কার্যকম উন্নয়ন করি তা শিক্ষক কেন্দ্রীক। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতির

আলোকে শিখন শেখানোর কার্যক্রম উন্নয়ন বহুমাত্রিক ধারায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের গুরুত্ব

দিতে হবে।”

জনাব মোঃ শাহ্ধসঢ়; আলম, মহাপরিচালক, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (নেপ) তার বক্তব্যে

বলেন, “প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য যে রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি করা হয়েছে তা

আরো বাস্তবভিত্তিক করার জন্য আজকের আলোচনা থেকে যেসব মতামত ও সুপারিশগুলো উঠে

এসেছে আমরা এইগুলো অক্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করব। একই সাথে রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি খুব দ্রুত

বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে সেটি অনলাইন-ভিত্তিক অথবা মুদ্রিত অনুুলিপি হতে পারে।”

অনুষ্ঠানটির সভাপতি জনাব রাখী সরকার, কান্ট্রি ডিরেক্টর, রুম টু রিড বাংলাদেশ তার বক্তব্যে

বলেন, “করোনাকালীন সময়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি নিরূপণ ও তা পূরণের জন্য

রিমেডিয়াল প্যাকেজে তৈরী করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি আশা করি শিশুদের শিখন ঘাটতি পূরণে


রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।” তিনি গবেষণা কার্যক্রমটি যৌথভাবে

সফলতার সাথে সম্পন্ন করার জন্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান ও সেইসাথে

রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

রাখবে বলে আশা রাখেন।

এছাড়াও, সম্মেলনে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, জাতীয়

প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির সরকারি

কর্মকর্তাবৃন্দ ও মাঠ পর্যায়ের সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক,

আন্তর্জাতিক/জাতীয় উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ গবেষণাটির উপর মতামত রাখেন ও কিছু

সুপারিশ প্রদান করেন যার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ছিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল

শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের নিকট রিমেডিয়াল প্যাকেজেটি পৌঁছে দেওয়া, প্রাথমিক শিক্ষা

অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদন নেওয়ার পর প্যাকেজেটি ব্যবহার ও মুদ্রিত অনুুলিপি বিতরণের জন্য

যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের পদ্ধতি, অবিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উৎসাহ প্রদান

গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সর্বশেষে সম্মানিত অথিতিবৃন্দ করতালির মাধ্যমে গবেষণা পত্রটির মোড়ক

উন্মোচন করেন।

রুম টু রিড একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২২টি দেশে শিশুদের

শিক্ষা সহায়তায় কাজ করে আসছে। সংস্থাটি ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে

‘সাক্ষরতা কর্মসূচি’ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘মেয়েশিশুদের শিক্ষা সহযোগিতা কার্যক্রম’-

এর আওতায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে রুম টু রিড বাংলাদেশ

অনুমোদনক্রমে ঢাকা, নাটোর, কক্সবাজার ও সিরাজগঞ্জ জেলায় কাজ করছে।