বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভিন্ন ইয়ার্ডে প্রায় ২ যুগ ধরে পড়ে নষ্ট হচ্ছে ৩০০টির বেশি মালবাহী ওয়াগন। যার মুল্য প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। কিন্তু সেগুলো সংস্কার না করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হচ্ছে নতুন ওয়াগান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সান্তাহার, পার্বতীপুর ইয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি ওয়াগন পড়ে রয়েছে। মেরামতের উদ্যোগ না নেওয়ায় এগুলো এখন স্ক্র্যাপ (পরিত্যক্ত) হিসেবে থাকায় সেগুলো বিক্রির চেষ্টা চলছে বলে জানান অনেকেই।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শ্রমিকেরা বলছেন, পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ার্ডে পড়ে থাকা ওয়াগনগুলো কারখানায় নিয়ে মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব। এতে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় মেটালিসটিক রাবার ইউনিটের সরবরাহ না থাকা এবং চাহিদা কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে ওয়াগনগুলো ইয়ার্ডে ফেলে রাখা হয়েছে।
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দাবি, ওয়াগনের অর্থনৈতিক সময়-সীমা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ওয়াগুনগুলো মধ্যে রয়েছে কিছু ভ্যাকুয়াম (ব্রেকসহ) আর কিছু ননভ্যাকুয়াম (ব্রেক ছাড়া)। সেগুলো ধীর গতিতে চালাতে হয়। বর্তমান রেলপথে এগুলো চলাচল অনুপযোগী। মেরামত করে চলাচল উপযোগী করা অনেক ব্যয়বহুল। তবে পড়ে থাকা ওইসব ওয়াগনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রেলের পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন ইয়ার্ডে পড়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩০০ মালবাহী ওয়াগন। যেগুলো প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হয়। ওয়াগনগুলোর মধ্যে মাত্র ২১ টি সচল যা সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাসহ রেলের বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। বাকিগুলো দেশের বিভিন্ন জংশন ইয়ার্ডে পড়ে আছে প্রায় দেড়যুগ ধরে। একটি ওয়াগন চলাচলযোগ্য করতে ১৬টি করে মেটালিসটিক রাবার ইউনিট প্রয়োজন হয়। একেকটি মেটালিসটিক রাবার ইউনিটের আমদানিমূল্য ছয় হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা।
সৈয়দপুর রেলওয়ের এক উপসহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সৈয়দপুর কারখানায় অতি প্রয়োজনীয় মেটালিসটিক রাবার ইউনিটের যোগান না থাকায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বিসি ধরনের মালবাহী ওয়াগন মেরামত করা হচ্ছে না। এ কারণে শান্তাহার জংশন ইয়ার্ডে ৯০টি বিসি ও ২৫টি বিসিএফজি বা হপার ওয়াগন রয়েছে। এছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদী ইয়ার্ড থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ আরও ৫০টি ওয়াগন সান্তাহার ডিপোতে এনে রাখা হয়েছে। একই কারণে পার্বতীপুর ওয়াগন ডিপোতে ১২০টি ওয়াগন পড়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে রেলওয়ে বিভিন্ন জংশন স্টেসনে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩২৯ ওয়াগন পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, ৮/৯ বছর আগে ভারত ও ইংল্যান্ড থেকে মেটালিসটিক রাবার ইউনিট আমদানি করা হতো। সেগুলো ব্যবহার করে কিছুদিন চলার পর ওয়াগনগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। এ কারণে এসব যন্ত্রাংশ আমদানির আর কোনো উদ্যোগ নেয়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া মালামাল পরিবহনে এসব ওয়াগনের তেমন চাহিদা না থাকায় প্রশাসন এগুলো মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যার ফলে ওয়াগনের বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে। সেগুলো এখন মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যক্রমের আখড়ায় পরিনত হয়েছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমান বলেন,কর্মকর্তারা বলছেন রেলে মালবাহী ওয়ানের চাহিদা নেই অথচ বাংলাদেশ রেলওয়ে ভারত থেকে ৪২০ টি মালবাহী ওয়াগন আমদানি করেছে। তিনি বলেন, কাগজে কলমে অর্থনৈতিক আয়ুকাল শেষ হলেও অবকাঠামো ঠিক থাকলে সেগুলো মেরামত করা সম্ভব।
যেমন অর্থনৈতিক মেয়াদ উত্তীর্ন অনেক যাত্রীবাহী কোচ (ক্যারেজ) শিডিউলের মধ্যেই জেনারেল ওভার হোলিং শপে (জিওএইচ) এর অথবা প্রকল্পের মাধ্যমে মেরামত করে নতুন প্রাণ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে যে টাকায় একটি ওয়াগন আমদানি করা হয়। মেটালিসটিক রাবার ইউনিট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এনে জিওএইচ কিংবা প্রকল্পের মাধ্যমে তার চারভাগের এক ভাগ খরচে ওয়াগনগুলো মেরামত করে এয়ারব্রেকসহ আধুনিক রুপ দেওয়া ও সম্ভব। এতে কোটি কোটি টাকার মূল্যের পড়ে থাকা ওইসব ওয়াগনও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
যেমন অর্থনৈতিক মেয়াদ উত্তীর্ন অনেক যাত্রীবাহী কোচ (ক্যারেজ) শিডিউলের মধ্যেই জেনারেল ওভার হোলিং শপে (জিওএইচ) এর অথবা প্রকল্পের মাধ্যমে মেরামত করে নতুন প্রাণ দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে যে টাকায় একটি ওয়াগন আমদানি করা হয়। মেটালিসটিক রাবার ইউনিট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ এনে জিওএইচ কিংবা প্রকল্পের মাধ্যমে তার চারভাগের এক ভাগ খরচে ওয়াগনগুলো মেরামত করে এয়ারব্রেকসহ আধুনিক রুপ দেওয়া ও সম্ভব। এতে কোটি কোটি টাকার মূল্যের পড়ে থাকা ওইসব ওয়াগনও নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
এসব বিষয়ে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, একটি ওয়াগনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ বছর থাকে। কিন্তু পড়ে থাকা ওইসব ওয়াগন প্রায় ৭০ বছর আগের। পুরাতন পদ্ধতিতে তৈরি ওইসব ওয়াগন বর্তমান রেলপথে চলাচল অনুপযোগী। বেশিরভাগেরই বডি, চাকা, বেয়ারিংসহ প্রায় সবকিছুই নস্ট হয়ে গেছে। সেগুলো পুনরায় মেরামত করা সম্ভব নয়। পড়ে থাকা ওয়াগান গুলোর যেগুলো মেরামত করা হচ্ছে সেগুলো আবার চলাচলের পর অকেজো হয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, পড়ে থাকা ওইসব ওয়াগন সংস্কার করতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা সরেজিমন প্রতিবেদন দেওয়ার পর সেগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
-খবরপ্রতিদিন/ সি.ব