বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
logo
Breaking News
ঝালকাঠির নলছিটিতে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৯ কর্মকর্তাকে বদলি পাবনায় মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের উদ্যোগে শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিক পালন হামের উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু চাঁদাপুর লঞ্চঘাটে চাঁদা না দেয়ায় দুই যাত্রীর ওপরে হামলা, থানায় জিডি বিদ্যুতের দাম বাড়ল দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে: মির্জা ফখরুল বাজেট তৈরি হচ্ছে সাধারণ মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে: অর্থমন্ত্রী আসামি সোহেল-স্বপ্না নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতে যা বললেন "প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী কোথায় যাবেন তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে"
সারাবাংলা পর্যটনের জোয়ারে সাতক্ষীরা : প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও টেকসই পরিকল্পনা
logo

পর্যটনের জোয়ারে সাতক্ষীরা : প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও টেকসই পরিকল্পনা

সম্প্রতি ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যে বিপুল পর্যটক সমাগম ঘটেছে, তা শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নয় বরং এটি জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী বার্তা। সুন্দরবন, রূপসী ম্যানগ্রোভ, মোজাফফর গার্ডেন, সীমান্তভিত্তিক পর্যটন এলাকা, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলোয় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে যে সাতক্ষীরা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পর্যটনকে বলা হয় ধোঁয়াবিহীন শিল্প। কারণ একটি পর্যটক যখন কোনো এলাকায় ভ্রমণ করেন, তখন তিনি শুধু একটি টিকিট কেনেন না; বরং পরিবহন, আবাসন, খাদ্য, বিনোদন, স্থানীয় পণ্য, সংস্কৃতি এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার অর্থনীতিকে সচল করেন। ফলে পর্যটনের প্রতিটি টাকা বহু মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে ওঠে।

সাতক্ষীরার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। পর্যটক বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, মধু, গোলপাতা, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে স্থায়ী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল।

আজকের পর্যটক শুধু একটি সুন্দর জায়গা দেখতে চান না। তিনি চান উন্নত সেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, তথ্যসমৃদ্ধ গাইড, নিরাপদ ভ্রমণ, মানসম্পন্ন আতিথেয়তা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ।
এই বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা পর্যটন ব্যবস্থাপনা, হোটেল অপারেশন, ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজমেন্ট, ট্যুর গাইডিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, খাদ্য ও পানীয় সেবা, গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং পর্যটন উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান অর্জন করছে। ফলে তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং চাকরি সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

সাতক্ষীরার পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে কয়েকটি ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল তৈরির বিশেষ সুযোগ রয়েছে। প্রথমত, সুন্দরবনভিত্তিক প্রশিক্ষিত ইকো ট্যুর গাইড তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় যুবকদের মাধ্যমে হোমস্টে ও কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম পরিচালনা করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ কর্মী তৈরি করা। চতুর্থত, স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খাদ্যভিত্তিক পর্যটন উদ্যোক্তা গড়ে তোলা। পঞ্চমত, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ ও পর্যটন বিপণনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সাতক্ষীরাকে পরিচিত করা।

বিশ্বের বহু দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের চেয়ে মানবসম্পদকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ দক্ষ মানুষই সম্পদকে সম্পদে রূপান্তর করে। সাতক্ষীরার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সুন্দরবন আমাদের রয়েছে, নদী রয়েছে, জীববৈচিত্র্য রয়েছে, ঐতিহ্য রয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব সম্পদকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তি।

তবে শুধু পর্যটক বাড়লেই হবে না। টেকসই পর্যটনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত স্থাপনা, যানজট এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি এখন থেকেই বিবেচনায় নিতে হবে। পর্যটন উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে একই সূত্রে গাঁথতে না পারলে ভবিষ্যতে এই সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এজন্য প্রয়োজন জেলা পর্যায়ে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা। যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্পের চাহিদার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে।

সাতক্ষীরার সামনে আজ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভার। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদ নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে সাতক্ষীরা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

পর্যটনের এই জোয়ারকে যদি আমরা সাময়িক উৎসব হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারি, তবে সাতক্ষীরার হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং জেলার অর্থনীতিতে সূচিত হবে এক নতুন অধ্যায়। সেই লক্ষ্যেই আজ প্রয়োজন পর্যটন শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনার সমন্বিত যাত্রা।

খুঁজুন