English Version

আমরা সবাই কবি হয়ে যাই

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ৫, ২০১৭, ৮:০৭ অপরাহ্ণ


গত পর্বের পর অনেকেই হয়তো জীবনের পরিকল্পনার অবশিষ্ট অংশ পড়তে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। দয়া করে আমার সঙ্গে একটু অপেক্ষা করতে হবে। সংগত কারণে আজকের পর্বে সাহিত্যচর্চার ওপর একটু আলোকপাত করতে চাই। ইংল্যান্ডে বাংলা মিডিয়া ও সাহিত্যচর্চার এক শ বছর উপলক্ষে এ দেশের সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা শিগগিরই পালন করতে যাচ্ছেন ‘বিলেতে বাংলা মিডিয়ার শতবর্ষ’। ১৯১৬ সালে এখানে প্রথম ‘সত্য বাণী’ নামে একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। শুনতেই অবাক লাগে যে শত বৎসর আগে এখানে বাংলা পত্রিকা বের হয়েছিল।

প্রবাসে বসে সাহিত্যচর্চা করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। ইতিপূর্বে একটি কবিতায় উল্লেখ করেছি, এখানে পৃথিবীটা হলো কাগজের পৃথিবী। আর আপনারা হয়তো বুঝতেই পারছেন আমি টাকার পৃথিবীকেই কাগজের পৃথিবী নামে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছি। এখানে ঘুম থেকে উঠে কাজ এবং কাজ শেষে ঘুম। তাই যারাই একটু আধটু সাহিত্যচর্চা করছেন না কেন, সকলেই কৃতিত্বের দাবিদার।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি। আর এই নান্দনিক ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনেকেই ভাবুক, বাউল, কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে যাই। বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে পাঠকের চেয়ে কবিদের সংখ্যাই বেশি। এতে দোষের কিছু দেখি না। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সাহিত্যচর্চা মনের একটি অন্ন।

এ প্রসঙ্গে একটি ছোট অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাই। আমার মতো অনেকেই হয়তো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে ভাবতে হতাশ হয়ে আছেন। এই যে শিক্ষাব্যবস্থার দৈন্যদশা, এ নিয়ে একটি প্রবন্ধ আজ থেকে ২০ বছর আগে দৈনিক বাংলাবাজারে পত্রিকায় লিখেছিলাম। তখন শ্রদ্ধেয় মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক।

এ নিয়ে এখন আর লেখালেখি করেও কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। আর লিখতে চাইলেও কোথা থেকে শুরু করবেন এবং কোথায় শেষ করবেন, তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে হয়তো আপনি খেই হারা হয়ে পড়বেন। কর্তারা যেভাবে কারিকুলামের কাঠামো তৈরি করেন তাতে শুধু মুখস্থ বিদ্যা। এই মুখস্থ বিদ্যার গ্যাঁড়াকলে পড়ে কত শিক্ষার্থী যে অকালে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে গেছে তার হিসাব কে রাখে! বাংলাদেশে নির্বাচিত কিছু প্রশ্ন মুখস্থ করলেই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়ে পাস করা যায়। কিন্তু উন্নত বিশ্বে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বোর্ডগুলো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে একজন ছাত্র কতটুকু বুঝতে পেরেছে তাই পরীক্ষা করে থাকে।
আমি ছোটবেলা থেকে এই মুখস্থ বিদ্যাকে ভয় পেতাম। তাই হাইস্কুল থেকেই দুই–একটি প্রশ্ন মুখস্থ করার পরই যখন মাথা ধরত, যখন আর পড়তে ভালো লাগত না, তখনই উপন্যাস আর কবিতার বই পড়তে শুরু করতাম। পড়তে পড়তে একপর্যায়ে লিখতেও অনুপ্রাণিত হয়ে পড়তাম। আমার ছোট ভাই যখন নটর ডেম কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে তখন তার পড়ালেখার যে চাপ দেখলাম, তাতে রীতিমতো চিন্তিত হয়ে পড়ি। তার এই পড়ালেখা যাতে প্রকৃত পড়ালেখার অন্তরায় না হয়, তাই তাকে বললাম একটা উপন্যাস লিখতে।
আমার ভাইও কম যান না। একটি উপন্যাস লিখল এবং আমাকে পড়তে অনুরোধ করল। আমি ভাবলাম প্রথম উপন্যাস না পড়লেও চলবে। তাকে বললাম রেখে দিতে এবং ১৫–২০ বছর পরে নিজে নিজেই তিনি নিজের লেখা মূল্যায়ন করতে পারবেন। ও মা, কিছুদিন পরে দেখি একটি দৈনিক কাগজে তার ওই উপন্যাসটা ছাপা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। সে এক লম্বা কাহিনি। যা হোক, আমার উদ্দেশ্য ছিল তার ওপর থেকে পড়ালেখার চাপ কমানো। যা সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরেছিলাম। তিনি অবশ্য ইতিমধ্যে আরও তিনটি উপন্যাস লিখে ফেলেছেন।
সাহিত্যচর্চা মনে কি অনাবিল আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে তা একজন সাহিত্যপ্রেমী মাত্রই জানেন। আমি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেব আমার ভাইয়ের মতো গল্প–উপন্যাস লিখতে। আমাদের দেশে পাঠ্যপুস্তকে সবগুলো কবিতা–প্রবন্ধ থাকে পুরোনোদের লেখা। সেখানে নবীনদের স্থান নেই। কেন নেই আমার জানা নেই। নবীন লেখকদের ভালো লেখা পাঠ্যপুস্তকে থাকলে নবীনরা সাহিত্যের প্রতি আরও বেশি অনুপ্রাণিত হতো নিশ্চয়।
বুড়ো না হলে কেন যে মূল্যায়ন দেওয়া হয় না। শুধু নবীনরা কেন প্রবীণরাও গল্প উপন্যাস লিখে আনন্দ পেতে পারেন। সে আনন্দ অন্যদের শেয়ার করতে পারেন ফেসবুক অথবা ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে, পত্রিকাওয়ালারা না ছাপালেও। উপন্যাস লেখা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু কবিতা লিখতে সময় বেশি লাগে না। আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেন, কবিতা লিখতে কি করতে হয়। আমি উত্তর দিই আপনি যাই বলবেন তাই কবিতা। কবিতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ না হয় পরেই করলাম। কিন্তু শুধু তরুণদের একটু সম্যক ধারণা দিতে একটু প্রয়াস মাত্র।

কবিতা কি?
‘মাধবী গো আমার কলমিলতা (তন্বী অর্থে) কবিতা আমার স্ত্রী
অনন্তকাল ওরে নিয়ে ভাসমু আমি
আসমানেতে, উড়ে উড়ে কবিতার চোখে দেখমু পৃথিবী।’

এতটুকুই যথেষ্ট ছিল। কবিতা আমার স্ত্রী! তাঁকে নিয়ে উড়ব আর দেখব পৃথিবী। কিন্তু শেষ হয়েও হবে না শেষ। তাই আরও একটু সম্প্রসারিত না করলেই নয়।
আমার কাছে কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক তরুণ (তরুণীরাও) প্রশ্ন করেন। বিচিত্র ধরনের অনেক প্রশ্ন। পেশাগত জীবনে আমি ব্যারিস্টার। স্বাভাবিকভাবেই আইনের ওপর প্রশ্ন আসবে। কিন্তু সাহিত্য নিয়েও অনেক প্রশ্ন। যেহেতু একটু আধটু সাহিত্যচর্চা করি তাই সাহিত্যে নিজেরও ইন্টারেস্ট যথেষ্ট। অনেক ভালো লাগে তাদের প্রশ্ন দেখে। আমি নিজেও একজন চির তরুণ (তাদের মতো আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিতে চাই)।
ধারাবাহিক এই রচনার এক পর্বে লিখেছিলাম আমাদের যুগে যদি আমরা সাহিত্যের (গদ্য ও পদ্য) ধারা বদলে দিই তাহলে কোনো সমস্যা নেই। অনেকেই আমার এ বক্তব্য পজিটিভভাবে নিয়েছেন এবং দু-একজন কবিতা লেখা শুরুও করে দিয়েছেন। খুবই ভালো লেগেছে শুনে। একজন আমাকে অনুরোধ করলেন তাঁকে কবিতা শেখাতে। আমি বললাম, বাহ্! এইতো কবিতা। তুমি যা বলবে তাই কবিতা।
কবিতায় খরখরে আর রস-কষে শব্দ দুটির সঙ্গে পরিচিতি থাকলেই হলো। কিছু কিছু লেখা আছে রসকষ নাই, খরখরে। আবার কোনো কোনো কথামালা আছে রসালো। রিদম থাকবে ছন্দ থাকবে। দুই লাইনের শেষের শব্দে ছন্দ থাকা জরুরি আছে বলে মনে করি না। কিন্তু কোথাও যেন ছন্দ একটা খোঁজা চাই। আমার লেখা কবিতা ‘পলকে বিচ্ছেদ’ একটু পড়ে ছন্দের ভিন্ন ধারা সম্পর্কে একটু ধারণা পেতে পারেন। অস্পষ্টতা কবিতা নয়। কেন যে বড় বড় কবিরা কবিতাগুলো অস্পষ্ট রেখে দেন আমার মতো আনাড়ির বোধগম্য নয়। এ দেশে বড় বড় কবিদের এ নিয়ে বিতর্ক করতে দেখেছি। যার সারসংক্ষেপ করলে এই দাঁড়ায় যে—কবিতা নাকি একটি মেশিন অথবা আপনার মন, যা হবে বন্য পশু। পুরো পাগল আর কি! অন্য একদিন এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার প্রত্যয় রইল।
ছন্দ নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানোর শ্রেয়। বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি আছেন, স্কুলের বারান্দায় যেতে পারেননি। তারাতো মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না!
বর্তমান যুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা ও আমেরিকাপ্রবাসী কবি ফকির ইলিয়াসের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছিল। তিনি বললেন, কবিতা হলো সাধনার ফসল। একজন যতই পড়বে তার চক্ষু ততই উন্মোচিত হবে, লিখবে কবিতা। তার মতে কবিতা যদি চিন্তার দুয়ার খুলে না দিল তা কেন হবে কবিতা। কবির সঙ্গে একমত না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমার আবেগ মিশ্রিত অভিমত দেওয়ার আগে দেখা যাক কবিতার শাব্দিক অর্থ কি? অথবা কোথা থেকে কবিতা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে।
ইংরেজি poem গ্রিক ভাষা ‘poíēma’ থেকে আসে, যার অর্থ ‘তৈরি করা জিনিস’ এবং একজন কবিকে প্রাচীন অর্থে ‘জিনিসগুলোর নির্মাতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সুতরাং যদি কোনো কবিতা তৈরি করা জিনিস হয়, তাহলে কি ধরনের জিনিস এটি? এ অর্থে যেকোনো কিছু কবিতা হতে পারে। যেমন আপনি একটি দৃশ্য চিত্রায়িত করলেন, তা কবিতা হতে বাধ্য। অথবা আপনি একটি কেক বানালেন, তাও কবিতা।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে কবিতা কোনো কঠিন বিষয় নয়। শব্দ ও সুরকারের মধ্যস্থলে একটি ঐতিহাসিক ক্ষমতা রয়েছে—‘লাঠি ও পাথর আমার হাড় ভেঙে দিতে পারে, কিন্তু শব্দগুলো আমাকে আঘাত করতে পারে না।’ কথাগুলো কতটুকু সত্যি। শব্দ মানুষকে হত্যা করতে পারে। কবিতায় পুরোপুরি জীবন থাকতে হবে। যা হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। এই যে ওপরে বললাম কবিতা আমার স্ত্রী। একটি কবিতা পাঠকদের শারীরিকভাবে আকৃষ্ট করতে না পারলে তা কবিতা কেন হবে? কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার কবিতাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
অন্যান্য মিডিয়া আমাদের চোখের সামনে আছড়ে পড়ে—টেলিভিশন, সিনেমা দেখি অথবা যদি আমরা খবর দেখি অথবা আমাদের টুইটার ফিডটি সংগ্রহ করি। আমরা অশ্রু সংবরণ করতে পারি না। কবিতা ভাবনার দুয়ার যেমন খুলে দেবে তেমনি সিনেমা দেখলে যেভাবে আমরা হাসি–কাঁদি, তেমন কবিতা হাসাতে, কাঁদাতে যদি পারে তবে তা যেমন পাঠকপ্রিয় হবে, তেমনি লেখক যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে পারেন পাঠকের হৃদয়ে। জনপ্রিয়তা পাবে বাংলার কবিতা। একটি কবিতা মনকে তার সুচিন্তিত ভাবমূর্তি নিয়ে একাগ্রচিত্তে ভাবতে সাহায্য করে এবং সেই চিন্তার নিদর্শনগুলোকে নতুন করে বারবার পরিচিত করতে সাহায্য করে।
আজকাল পাঠক ধীরে ধীরে কবিতা থেকে সরে যাচ্ছেন। অবশ্য বাংলা ভাষা একটু ভিন্ন। আশাব্যাঞ্জক হলো বাংলা ভাষায় সর্বদাই কবি–সাহিত্যিকেরা নিরলস কবিতাচর্চা করে যাচ্ছেন। পৃথিবীতে একটি মাত্র ভাষা যা আন্দোলন–লড়াইয়ের মাধ্যমে বঙ্গভাষাবাসী লোকেরা রক্ষা করে ইতিহাস তৈরি করেছেন। পৃথিবীতে আর কোনো ভাষা আছে যা রক্ষা করতে লড়াই করতে হয়েছে?

কবিতা কবিতায় কবিতায়

কবিতা হলো শিল্প কবিতা দেবে ভাষা
অমৃত থাকবে কিছু মাতাল করা নেশা;
কাঁদাবে, হাসাবে, ভাসাবে তোমায়
উড়িয়ে দেবে আসমানে, তুমি ঘুরবে নীলিমায়;
যেথায় চোখ তোমার তারায় তারায় দেখবে মায়ায়
থোকায় থোকায় চিলতায় চিলতায় কুড়াবে চান
ভাসিয়া ভাসিয়া শ্রান্ত দেহে অবশেষে ক্লান্ত মনে
ভাঙা চান্দের আলোয় তুমি করবে সন্ধ্যা-স্নান।
কবিতায় থাকবে জীবন, বলবে কথা গাইবে সুরে গান
কবিতার আড্ডায় আইলে তুমি বইতে দিমু খুইলা আমার জান।

আমি কবিতা লিখি কাগজের পৃথিবী থেকে মুক্তির তাগিদে। চলেন আমরা সবাই কবি হয়ে যাই। কারণ আমাদের দেশটাই তো শিল্পীর তুলিতে আঁকা একটি কবিতা।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT