English Version

ঢাকা অপপরিকল্পনার শহর

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৩, ২০১৭, ৭:৪৩ অপরাহ্ণ


গর পরিকল্পনাবিদ। নগর উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ, ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা ও অনারারি চেয়ারম্যান। দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে। ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৩ সালে। তিনি নিয়োজিত ছিলেন সরকারের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে তার প্রকাশিত নিবন্ধের সংখ্যা শতাধিক। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম একাধারে শিক্ষক, গবেষক, নগর বিশেষজ্ঞ, শিল্প সমালোচক ও পরিবেশবাদী। জলাবদ্ধতা, নগর পরিকল্পনার ত্রুটিসহ নানা বিষয়ে সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এম এম মুসা ও আবু সাঈদ
ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণ কী?
এ জলাবদ্ধতা সবসময় হয় না। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলে নগরবন্যা বা জলাবদ্ধতা হতে পারে। বর্ষাকালে বাংলাদেশে দিনের পর দিন বৃষ্টি হয়। অনেক সময় দেখা যায়, সাতদিন বা তার বেশি ক্রমাগত বৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ ভারি বৃষ্টিপ্রবণ দেশ এবং ঢাকা-চট্টগ্রামে প্রচুর বৃষ্টি হয়। সারা বছরই বৃষ্টিপাত হয়, তবে বর্ষাকালে বেশি হয়। কোনো কোনো সময় ২৪ কিংবা ৭২ ঘণ্টা অতিমাত্রায় বৃষ্টি হয়, যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ৩০ বছরের গড়ের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হলে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ঢাকা ৪০০ বছরের পুরনো শহর, কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তোলা হচ্ছে ৫০ কিংবা ৬০ বছর ধরে। ঢাকা নিয়ে ব্রিটিশ আমলে একটা মামুলি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। এটি করেছিলেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডিস। তিনি কয়েক দিনের সফরে এটি তৈরি করেছিলেন। এ পরিকল্পনা, যার নাম ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’ করা হয় ১৯১৭ সালে। তিনি একটি ছোট রিপোর্ট দিয়েছিলেন, কিন্তু তা ছিল খুব ভালো। সেখানে অনেক কিছুরই হয়তো বিস্তারিত নেই, কিন্তু মূলে যা ছিল তা আমাদের সঙ্গে খুব প্রাসঙ্গিক। ১০০ বছর আগে তিনি বলেছেন, এটি একটি ব-দ্বীপ এলাকার শহর, চারদিকে নদী রয়েছে। এ শহরের ভেতরে চমত্কার খাল (তত্কালীন ধোলাই খাল ইত্যাদি) রয়েছে। এ শহর পরিকল্পনায় এসব নদী ও খাল সংরক্ষণ করতে হবে এবং যেসব জলাশয় রয়েছে, সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে। এটা ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি একটি মৌলিক বার্তা দিয়েছিলেন যে, এ শহর যেহেতু বৃষ্টিপ্রবণ ও সমতল, এখানে বন্যা ও বৃষ্টির সময় পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে হবে এবং এজন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নদী ও খালগুলো সচল রাখা। ঢাকায় অসংখ্য পুকুর ছিল (এখনো কিছু আছে), সেগুলো সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছিল। এতে বৃষ্টি বা বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এখনো কিন্তু এ কথার মূল্য রয়েছে। ব্রিটিশরা অবশ্য সেই সুপারিশের তেমন কিছু বাস্তবায়ন করেনি। এরপর তৈরি হলো ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট বা ডিআইটি। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পিত নগর তৈরির পরিকল্পনা নেয়া হলো। ঢাকা তখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য ডিআইটি করা হলো ১৯৫৩ সালে। এর আগে নগরের পরিকল্পনা করত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। ডিআইটি সে সময় একটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা হলো— একটি ব্রিটিশ কোম্পানিকে দিয়ে নগর পরিকল্পনা করানো। যেটা হলো ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান, ১৯৫৯ সালে। আমরা ধরে নিতে পারি, এটা ছিল ১৯৬০-৮০ পর্যন্ত অর্থাৎ ২০ বছরের জন্য। এ পরিকল্পনায় কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা আর শিল্পাঞ্চল হবে তা চিহ্নিত করা হলো। শহরের সড়কবিন্যাস পরিকল্পিত হলো। এটি মোটামুটিভাবে একটি ভালো প্ল্যান ছিল। এ পরিকল্পনার ভিত্তিতেই আধুনিক ঢাকার নির্মাণ শুরু হয়। তবে এ পরিকল্পনার আগেই তিনটি ভালো কাজ হয়েছিল। একটি হলো আজিমপুর কলোনি, আরেকটি মতিঝিল কলোনি। আর তখনকার দিনের অত্যন্ত আধুনিক এক শপিং সেন্টার— নিউ মার্কেট। আধুনিক একটি হোটেল ছিল— শাহাবাগ হোটেল। ডিআইটির আগেই ধানমন্ডির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধানমন্ডির প্ল্যানটা দেখলে মূল কথাটা পাওয়া যায়। এ পরিকল্পনার প্রশংসনীয় দিক হলো লেক। এখানকার খালটা সংস্কার করে লেক তৈরি করা হয়। অর্থাৎ বন্যা বা বৃষ্টির পানি এখানে সংরক্ষণ করা হবে। এটা করল ডিআইটি, তখনো রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) তৈরি হয়নি। রাজউক হওয়ার পরে তারা নিজেদের মাস্টারপ্ল্যানের মধ্যে প্যাট্রিক গেডিসের মতো খালগুলোকে স্বীকৃতি দিল। রাজউক বলেছিল, অধিকাংশ খাল সংরক্ষণ করা হবে, এক-দুটো খাল (এটা হয়তো তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল) ভরাট করা হবে। যেমন— ধোলাই খাল রাজউক বলেছিল আংশিক ভরাট করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে পুরোটাই ভরাট করা হয়। রাজউকের ১৯৫৯ সালের পরিকল্পনায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আমলে নেয়া হয়েছিল। ঢাকার তখনো এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। ১৯৫৩ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল সাড়ে চার লাখ। সিঅ্যান্ডবির দ্বারা হলো লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর। এটা খুব সুন্দর পরিকল্পনা ছিল; প্রত্যেক জায়গায় জলাশয়, খেলার মাঠ, পরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থা রয়েছে। আর ডিআইটির মাধ্যমে হলো বনানী, গুলশান, উত্তরা। তখনো বারিধারা হয়নি। প্রতিটিতে খাল ও লেক রাখা হয়েছে। বনানী, গুলশানের মাঝখানে একটি লেক, গুলশান-বারিধারার মাঝখানে আরেকটি লেক। উত্তরায় লেক রয়েছে। রাজউক বা ডিআইটি যা করেছিল তা ছিল সঠিক। লেক মানে জলাধার তৈরি করা। ঢাকা শহর হবে ব্রাউন, গ্রিন ও ব্লু। ব্রাউন মানে বিল্ডিং, গ্রিন মানে গাছপালা, ব্লু মানে জলাশয়। এগুলোই তো বেসিক প্রিন্সিপল। আমি মনে করি, চাইলেই ঢাকায় ৪০ ভাগ সবুজ ও নীল রাখা যায়। যেহেতু এটি বৃষ্টিবহুল এবং এখানে সহজে গাছপালা হয়, তাই এটা এখানে খুব অল্প খরচে করা সম্ভব। ঢাকা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সরকারি-বেসরকারি বহু পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে হয় ১০ লাখ। ১৯৫৯ সালের পরিকল্পনায় ধরা হয়েছিল, ১৯৮০ সালে লোকসংখ্যা হবে ১৬ লাখ কিন্তু হয়েছিল ৩৪ লাখ। এ বিপুল জনসংখ্যার জন্য জায়গা করতে গিয়ে জলাশয়গুলো ভরাট করা শুরু হয়। রাজউক অবশ্য প্রথম দিকে সব উঁচু ভূমিতে ভবন নির্মাণ করেছে। পরে নগর নিয়ে মহাপরিকল্পনা করতে প্রায় ৪০ বছর কেটে যায়। ১৯৯৫ সালের পরিকল্পনা অনুমোদন পায় ১৯৯৭ সালে। এটা রাজউকের পরিকল্পনা। এখানেও বন্যা, প্লাবন, অতিবৃষ্টি ও নগরবন্যার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে খালগুলো পুনর্খননের কথা বলা হয়েছে। ঢাকার চারপাশে বিশেষ করে পূর্ব ঢাকায় জলাধার রাখার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেটা তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ডিটেল এরিয়া প্ল্যান করতে করতে চলে আসে ২০১০ সাল। ১৯৯৫ সালের প্ল্যানের ডিটেল এরিয়া প্ল্যান হলো ২০১০ সালে, অথচ এটা হওয়া উচিত ছিল সঙ্গে সঙ্গে। পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন করেনি। বাস্তবায়ন করা রাজউকের দায়িত্ব ছিল কিন্তু তারা গাফিলতি করেছে। এর মধ্যে ওয়াসা এসেছে। প্রথমে ওয়াসার দায়িত্ব ছিল পানি সরবরাহ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা। পরে তাদের পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব দেয়া হলো। ওয়াসা চেষ্টা করেছে কিন্তু কার্যকর হয়নি। এখন ওয়াসার অবস্থা হয়েছে— ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এখন বলছে, পানি নিষ্কাশন সিটি করপোরেশনের কাজ, তারা এটা ফেরত নিক। কিন্তু পানি সরবরাহও তো মিউনিসিপালিটির কাজ ছিল, তারা সেটা ফেরত দেবে না। ওয়াসা পানি শতভাগ দিতে পারলেও সুয়ারেজের ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ। সারফেস ড্রেনগুলো সিটি করপোরেশনের, আর আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেনগুলো ওয়াসার। সারফেস ড্রেনগুলো সিটি করপোরেশন পরিষ্কার রাখতে পারছে না। এজন্য তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখাচ্ছে।
ড্রেন নিয়ে এমন বিভক্তিতে কি দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না?
না, নির্দিষ্ট করা থাকলে সমস্যা নেই। সিটি করপোরেশন যদি নিষ্ঠার সঙ্গে তার দায়িত্বটা পালন করে তাহলে অসুবিধা হয় না। এ দায়িত্বগুলো সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে। যে কাজ যার, তা না করলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে— এমন হওয়া উচিত ছিল।
সিটি করপোরেশনের আওতায় সবকিছু কি থাকা উচিত নয়?
অবশ্যই দরকার। এখন এ দাবিটা জোরদার হচ্ছে। পেছন ফিরে দেখলে দেখা যাবে— আগে সবকিছু সিটি করপোরেশনের (বা মিউনিসিপ্যালিটির) আওতায় ছিল। একটা বিষয় হলো, রাজউক পরিকল্পনা অনুযায়ী জলাধার সংরক্ষণ বা ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি। রাজউক আবার ২০১৫ সালে নতুন করে ‘ঢাকা কাঠামো পরিকল্পনা’ করেছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক একটি কনফারেন্স করেছে। সেখানে তারা পূর্ব ঢাকাকে বিশাল সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা বলছে, ‘ড্রিমিং গ্রেট ঢাকা’। এরই মধ্যে প্রভাবশালী ল্যান্ড ডেভেলপাররা ওদিকে চলে গেছেন। আবাসন ব্যবসায়ীরা রাজউকের অনুমতি নিয়ে সবকিছু করলেও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখছেন না। পুকুর, খাল সব ভরাট করে ফেলছেন। পূর্ব ঢাকার জন্য বিশ্বব্যাংকের মার্টিন রামা চারটি সুপারিশ দিয়েছেন। এক নম্বর হলো, পূর্ব ঢাকার উন্নয়নের জন্য পূর্বদিকে একটি বেষ্টনী বাঁধ দেয়া হবে। এ রকম সর্বনাশা সুপারিশ আর হতে পারে না। আমরা পরিবেশবাদীরা বলছি, এখানে বাঁধ দেয়া যাবে না, বরং উন্মুক্ত রাখতে হবে যেন পানিপ্রবাহ ঠিক থাকে। তারা বলছে, স্লুইস গেট দিয়ে পানি বের করে দেয়া হবে। আমাদের যে ব্যবস্থাপনা, তাতে এটি চূড়ান্তভাবে ডিএনডি হয়ে যাবে, তাতে এমন ব্যবস্থা সঠিকভাবে চলবে বলে মনে হয় না। বাঁধ নির্মাণ করলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একমাত্র ওয়াসা এ বাঁধের বিরুদ্ধে। আমি বলব, বিশ্বব্যাংক যা-ই করুক না কেন রাজউকের পরিকল্পনা সামনে রেখে করতে হবে। রাজউক দীর্ঘদিন ধরে অনেক অর্থ ব্যয় করে এ পরিকল্পনা করেছে। যদিও এখনো এটি অনুমোদন লাভ করেনি। এছাড়া আমাদের এখানে ডোনারদের মধ্যে মারাত্মক সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাপোর্টে ২০০৬ সালে সম্পন্ন হয় স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি)। প্রথমে দেড় কোটি লোকের শহর, যেখানে তাদের হিসাবে ২০ বছরে সাড়ে তিন কোটি হবে, সে শহরে মেট্রোলাইন দেয়নি। পরে সংশোধন করে ছয়টি মেট্রোলাইন সুপারিশ করা হয়। এটা অনুমোদন হওয়ার পরে পরিকল্পনা আবার রিভাইজ করে জাইকা। এগুলো করলে তো হবে না।
আমাদের পরিকল্পনা করতে কেন দাতাদের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে?
কারণ আমাদের অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। তারা পরিকল্পনায় না থাকলে উদ্যোগ নেবে না। আবার অনেক সময় তারাই পরিকল্পনা নিয়ে আসে। অনেক সময় আমরা চাই।
রাজধানীর ক্ষেত্রে এ রকম করাটা কি ঠিক হয়েছে?
রাজউকের প্ল্যানটা ঠিক আছে। এখানে দেশী লোকরা কাজ করছে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে পরামর্শক আনা যেতে পারে। কিন্তু মূল চিন্তাটা আমাদেরই হবে। যেমন— আমরা মেট্রোরেল করতে জানি না, অতএব যারা জানে তাদের আমরা নিয়ে আসব। নগরের সমস্যার সমাধানের জন্য দেশী লোকদের বারবার বসতে হবে। আবার শুধু বসলে হবে না, তা আরো জোরদার করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের সম্মেলনে আসা শিলা দীক্ষিত চমত্কার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। প্ল্যান অনুমোদন হওয়ার পর তা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। দিল্লিতে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া একটি রুমও বাড়ানো যায় না। না মানলে তারা এসে ভেঙে দেয়। কিন্তু আমাদের রাজউকের তো এমন ক্ষমতা নেই। অতত্রব কর্তৃপক্ষকে ‘কর্তৃপক্ষ’ বানাতে হবে। বলতে গেলে রাজউকের পর্যাপ্তসংখ্যক পরিকল্পনাবিদই নেই। তাদের দরকার একশর বেশি পরিকল্পনাবিদ, আছে হয়তো ১৫ জন। সেখানে থাকবে অভিজ্ঞ, মধ্যম অভিজ্ঞ ও নবীন পরিকল্পনাবিদ। আর রাজউক তো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। দিল্লির সঙ্গে তুলনা করলে দেখব তারা অথরিটি ও কমিটমেন্ট নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন কী করা যেতে পারে?
রাজউকের পরিকল্পনা দেখতে হবে এবং সেগুলো সঠিক কিনা যাচাই করতে হবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুড়িল থেকে পূর্বাচল ৩০০ ফুট রাস্তা হবে বলে ঠিক করলেন পরিকল্পনাবিদরা, কিন্তু তারা সড়কের পাশে কোনো খাল রাখেননি। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ৩০০ ফুটের দুদিকে ১০০ ফুট চওড়া দুটি খাল দিতে হবে, না হলে পানি সরবে কীভাবে? রাস্তা বানানোর সময় তো পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, তখন উত্তর-দক্ষিণের পানি কোথায় যাবে? এখন খাল করতে গিয়ে জমি অধিগ্রহণের জন্য জমির মালিকদের সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। প্রজেক্ট সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার, এর মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকার রাস্তা হবে। আর সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণ। আবার এখন পরিকল্পনাবিদরা পাঁয়তারা করছেন যে, খাল ঠিকই থাকবে তবে তিনশ ফুটের রাস্তাটা সংকুচিত করা হবে। এটা হলে গাড়ি চলবে কীভাবে? রেল দেয়ার কথা বলা হয়েছিল, তা এখনো করেনি। ধারণা করছি, পরবর্তীতে জায়গা নেই বলে ওভারহেড রেল বসানোর দাবি তোলা হবে। পূর্বাচলকে একটি ইনডিপেনডেন্ট, সেলফ সাপোর্টিং টাউন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যেন সেখানকার বাসিন্দাদের ঢাকায় আসতে না হয়।
আমাদের সব পরিকল্পনা ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে মানুষের ঢাকায় আসতে হয়…
এটা একটি সমস্যা। পূর্ব ঢাকা হওয়ার পর আরো ২০ থেকে ৫০ লাখ লোক সেখানে বসবাস করতে শুরু করবে। কেন্দ্রীয় ঢাকায় যাতে তারা না আসে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান, যেটা প্ল্যানিং কমিশন করছে, সেখানে গোটা বাংলাদেশের আরবান প্ল্যান রয়েছে। সেকেন্ডারি সিটি, মেট্রোপলিটন সিটি, ডিভিশনাল সিটি, জেলা শহর, উপজেলা শহর— এগুলোয় জোর দিতে হবে। যতটা পারা যায় বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
কিন্তু জেলা বা উপজেলা শহর পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে উঠছে না…
অধিকাংশের জন্য পরিকল্পনা করা রয়েছে। পরিকল্পনা থাকলে অনুমোদন নিতে হবে, অনুমোদন পেলে জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা করতেই হবে। এবং বাস্তবায়নে কোনো ব্যত্যয় করা যাবে না। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রামের অবস্থা এমন হলো কেন?
চট্টগ্রাম পাহাড়ি শহর, পানি নেমে যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু চাক্তাই খাল বন্ধ হয়ে গেছে, আগ্রাবাদের খালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এখন জোয়ারের পানি প্রবেশ করে। এটা বন্ধ করার ব্যবস্থা ছিল কিন্তু খুব একটা সফল হয়নি। আমাদের সব দৃষ্টি ঢাকার প্রতি, সেখানে তেমন নজর দেয়া হচ্ছে না। অথচ ঢাকা, চট্টগ্রামের জন্য একজন করে মন্ত্রী থাকা উচিত। সমস্যা হলো, আমাদের অথরিটিগুলো দুর্বল, এখানে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে।
পরিকল্পনাগুলো তো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না…
এজন্য সমস্যা আরো বাড়ছে। অনেকে বলেন, ঢাকা অপরিকল্পিত শহর। আমি বলব অপপরিকল্পনার শহর। পরিকল্পনা আছে কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। ১৯৯৫ সালে যখন প্ল্যান করা হয়, তখন আগামী দিনের কথা চিন্তা করা উচিত ছিল। ২০১৫ সালে যে প্ল্যান করা হয়েছে, তাতেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। যেমন— বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বলা হয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে। কিন্তু তারা কোথায় যাবে? আমরা কি তাদের জন্য চিহ্নিত করে দিয়েছি যে এটি তোমার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। বিভিন্ন সেক্টরে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে? হয়নি। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প-কারখানা প্রভৃতি জায়গা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। এখন যেহেতু কেন্দ্রীয় ঢাকায় জায়গা নেই, তাই পূর্ব ঢাকাকে পরিকল্পনা করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে একই রকম সমস্যার পুনরাবৃত্তি না হয়। কেন্দ্রীয় ঢাকা থেকে লোক সরিয়ে নিতে হবে। নতুন লোক আসার চেয়ে বেশি মাত্রায় লোক সরিয়ে নিতে হবে। সেখানে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে লোকদের কেন্দ্রীয় ঢাকায় আসতে না হয়। যেমন— আশুলিয়ায় এত গার্মেন্ট কর্মী, তারা কি ঢাকায় আসে? না। আশুলিয়ার আশপাশে তারা নিজেরাই ব্যবস্থা করে নিয়েছে বা বেসরকারি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল এদের জন্য চমত্কার ডরমিটরির ব্যবস্থা করে দেয়া। এতে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেত। ঢাকার কাঠামো পরিকল্পনা, স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ও ড্রেনেজ প্ল্যানের মধ্যে সমন্বয় করা গেলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
সার্বিকভাবে এখন কী করা উচিত?
আমার পরামর্শ হলো, রাজউকের পরিকল্পনাটা বিবেচনায় নেয়া, ভুল-ভ্রান্তি থাকলে ঠিক করা, নতুন পরামর্শ থাকলে তা যোগ করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া। এর সঙ্গে অবশ্য ওয়াসার ড্রেনেজ প্ল্যান ও ঢাকার স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান সমন্বয় করতে হবে। কার্যকর নগর পরিচালন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT