English Version

ফলে বিষের বিষয়টি খোলাসা করুন

প্রকাশিতঃ জুন ৩, ২০১৮, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ


সে অনেক দিন আগের কথা। তখন চারদিকে আর্সেনিক আর্সেনিক বলে হইচই উঠেছে। দেনদরবার, মিটিং-মিছিলে চারদিক গুলজার। সরকার বলল, কতিপয় ব্যক্তি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, এরা দেশের শত্রু। বিদেশি অর্থে চালিত। আন্দোলন প্রায় ঠান্ডা। এই সময় জাতিসংঘের এক প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা একটা চিঠি তুলে দিলেন, যাতে বলা হয়, সরকার আরও ১০ বছর আগে থেকেই সমস্যাটি জানে। আর ঠেকায় কে? দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম বিষয়টি আমলে নিল। বাংলাদেশের বেশ জনপ্রিয় একটা সংবাদমাধ্যমের দিল্লির আঞ্চলিক অফিসের প্রতিনিধি তাঁর দলবল নিয়ে হাজির। উৎসাহের ঢোলে বিরাট বাড়ি—তাঁকে নিয়ে গেলাম পাবনার আর্সেনিকে আক্রান্ত এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, প্রচণ্ড ধাক্কা দিলেন আব্বাস আলী নামের বছর ৩৫-এর এক যুবক। খাস পাবনার ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলার সংমিশ্রণে কিছুটা গালি দিয়েই বললেন, ‘আপনেরা আগে ঠিক করেন কী কবেন, একবার কবেন টিপকল খা, আবার কবেন টিপকল উঠাই ফ্যালা, আকাশের জল খা। এটা কোন ব্যবসা? আমরা তো মরি।’

বিদেশি ক্যামেরা ক্রু আর সিনিয়র সাংবাদিকের চক্ষু চড়কগাছ। অনুবাদ যা-ই হোক, আব্বাস আলীর শারীরিক ভাষা তাঁর বিরক্তি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট ছিল।

আব্বাস আলীদের করুণ ইতিহাস এ দেশের উন্নয়নের জাঁতাকলে পিষে দেওয়ার ইতিহাস। ষাটের দশকের শেষ আর সত্তরের দশকের শুরুতে নিরাপদ পানির সহজ উপকরণ টিউবওয়েলের (যাকে আব্বাস আলী টিপকল বলছেন) কথা প্রচার করা হয়। প্রচার এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে টিউবওয়েল হয়ে ওঠে ভদ্র-সভ্য পরিবারের প্রতীক। আব্বাসের মনে পড়ে, তাঁর বড় বোন কাজল বেগমের প্রায় পাকা বিয়ে ভেঙে যায় বাড়িতে টিউবওয়েল না থাকার কারণে। এখন তাঁদের বাড়িতে গোটা তিনেক টিউবওয়েল। আব্বাস বলেন, এই টিউবওয়েলের কারণে এখন তাঁদের গ্রামে কেউ বিয়ে দিচ্ছে না। সবাই ভুগছে আর্সেনিকে।

পুরোনো এই গল্প মনে পড়ল মারমুখী হয়ে ওঠা বিষ প্রতিরোধ অফিসের কাণ্ডকারখানা দেখে। টন টন পাকা আম ট্রাকের নিচে ফেলে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। বছর তিনেক আগে ঢাকার প্রবেশমুখে আম, লিচুর ট্রাক আটকে ঢালাওভাবে দেশে উৎপাদিত ফল ধ্বংসের ঘটনা আমরা দেখেছি। চাষি আর মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সর্বস্বান্ত করার পর জানা গেল, ফরমালিন পরীক্ষা করার যন্ত্রটি সঠিক ছিল না।

পাকা ফলে প্রকৃতিগতভাবে কিছু পরিমাণ ফরমালিন থাকে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়। অতিরিক্ত ও ক্ষতিকর ফরমালিন মাপার যন্ত্রপাতি অন্য রকম আর তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। প্রয়োজন পরীক্ষাগার বা ল্যাবরেটরি পরিচালনায় দক্ষ ব্যক্তির। তার মানে তিন বছর আগের সব অভিযানই ছিল অনুমাননির্ভর আর ধারণাপ্রসূত। এবারের অভিযানেও তেমন গুণগত পরিবর্তন আসেনি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ওরা বলেছে মেডিসিন দিয়ে পাকিয়েছে, মেডিসিন মানেই তো বিষ, তাই আমরা ট্রাকের নিচে ফেলে বিষাক্ত আম ধ্বংস করেছি।’

গোলটা এখানেই, মেডিসিন মানেই বিষ, এটা কি ঠিক? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নাজমা শাহীন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ইথোফেন ব্যবহার করে ফল পাকালে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। এটি একধরনের গ্যাস, যা ফলের ভেতরের এনজাইমকে প্রভাবিত করে। ফলে ফল তাড়াতাড়ি পাকে। তিনি বেশ স্পষ্ট করে বলেছেন, আম আর কলার ক্ষেত্রে ইথোফেন ব্যবহারে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না।

দেশে আইন করে (নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩) একটি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বহাল করা হয়েছে। দেশে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা সব খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল ইত্যাদির মান নির্দিষ্টকরণ, নজরদারির দায়িত্ব এই কর্তৃপক্ষের। কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই আইন অনুযায়ী খাদ্য আদালত গঠন করেছে। মজার বিষয়, বিষাক্ত আম অনুসন্ধানে নিয়োজিত ভ্রাম্যমাণ আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আওতার মধ্যে কাজ করছেন না। নিরাপদ খাদ্য আইনের ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারায় খাদ্য পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ, যাচাই, জব্দ ইত্যাদি যাবতীয় দায়িত্ব নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) সঙ্গে সংযুক্ত আদালতের আওতায় ফলের বাজার বা ফলের বাগান পর্যন্ত প্রসারিত করা হলে সেটা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া উচিত।

ঢাকার একটি পাইকারি বাজারে অভিযানরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ইথোফেনের ব্যবহারের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইথোফেনের ব্যাপারে নাকি বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশে ইথোফেনের ব্যবহার আইনসিদ্ধ। প্রশ্ন করা যায়, কত আমে কী পরিমাণ ইথোফেন ব্যবহার করা হবে, তা কি কোথাও নির্দিষ্ট করা আছে? কৃষক বা ব্যবসায়ীরা যে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছেন না, তার কী নিশ্চয়তা আছে? যাঁরা চোর ধরতে মাঠে নেমেছেন, সেটা তাঁদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তাঁদের সে কারিগরি ক্ষমতা আছে কি? নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক বলেছেন, ফলে ব্যবহৃত রাসায়নিকের পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি বা ক্ষতিকর মাত্রার কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থাই নেই।

তাহলে ঘটনা কী দাঁড়াল? যখন আমি নির্ধারণই করতে পারছি না ফলে ক্ষতিকর মাত্রায় বিষ আছে কি নেই, তখন কেন, কোন অধিকারে বাজারের ফলগুলো পিষে দিচ্ছি আর জেল-জরিমানার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছি?

কৃষি মন্ত্রণালয় আমচাষি আর কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে কোন প্রজাতির আম কবে গাছ থেকে পাড়া যাবে, বাজারজাত করা যাবে, তার একটি ক্যালেন্ডার ঠিক করেছে। এই ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে ঠিকমতো মনিটরিং করলে আগে আম পাকানোর ল্যাঠা চুকে যায়। এই তালিকা একটু হালনাগাদ ও এলাকাভিত্তিক করা উচিত। সাতক্ষীরা অঞ্চলের আম আর বান্দরবান, রাঙামাটির আম জাত ও আবহাওয়ার কারণে
রাজশাহী অঞ্চলের থেকে আগে-পরে পাকে। তা ছাড়া আমাদের কৃষি গবেষণায় নতুন কোনো কোনো জাতের আমের ওপর গবেষণা চালানো
হচ্ছে, সেসব আমের দিন-তারিখে পরিবর্তন থাকতেও পারে।

আম বা ফল উৎপাদন, বাজারজাতকরণ আর রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে একসঙ্গে বসে একটা মানদণ্ড ঠিক করতে হবে। একেক কর্তৃপক্ষ একেক কথা বললে কৃষক মার খাবেন, কৃষি টিকবে না; মানুষ বুঝবে না কোন রাস্তাটা সঠিক।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT