English Version

মেয়েটির অঝোর কান্নায় ফোঁটা ফোঁটা কষ্ট

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮, ১১:১১ অপরাহ্ণ


অঝোরে কাঁদছিলেন মেয়েটি। কয়েক দিন ধরেই তাঁর মনের মধ্যে নানা শঙ্কা উঁকি মারছে। মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর শঙ্কা আরও বেড়েছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে বুক ধড়ফড় করছে। সেখানে ফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। এই প্রতিবেদকের ফোন লুকিয়ে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে কথা বলেছেন মায়ের সঙ্গে। দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের স্থানে বিষণ্ন মুখে ফিরে এলেন। ফোনটি ফেরত দিয়ে কান্না চেপে রাখতে পারলেন না। কান্নার দমক একটু কমে এলে ক্ষীণ গলায় জানতে চাইলেন, ‘আমার পাশে কি কেউ থাকবে না? আমি কি বিচার পাব?’

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) বসে কথা হচ্ছিল গণধর্ষণের শিকার মেয়েটির সঙ্গে। দর্শনার্থীদের বিষয়ে পুরো হাসপাতালের ঢিলেঢালা চিত্রের সঙ্গে ওসিসির কোনো মিল নেই। ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা, ফিঙ্গার লকড প্রবেশদ্বার, পুলিশি পাহারা—ওসিসি ঘিরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। দ্বিতীয় দিনের চেষ্টায় আজ শনিবার অনুমতি পাওয়া গেল মেয়েটির সঙ্গে দেখা করার।

মায়ের সঙ্গে কী কথা হয়েছে, জানতে চাইলে বলেন, ‘মা বলছে আমাকে নিতে পারবে না। আমাকে ঘরে নিলে তার বাস (বাড়িতে থাকা) উঠে যাবে। বৃদ্ধ বয়সে সে বাস হারাতে চায় না।’ আরও বলছেন, ‘আমার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হইছে। স্বামী মাকে বলছে, আমাকে সেও নিতে পারবে না।’ পরমুহূর্তে ধরা গলায় বললেন, ‘আমার তা বিশ্বাস হয় না। ও (স্বামী) এমন না। ও না নিলে আমি কোথায় যাব?’
তাঁর মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, ‘আমার বিষ খাওনের টাকা নাই, মেয়েরে ক্যামনে দ্যাখতে আসি। ওরে দ্যাখলে বাড়িতে আমার জায়গা হবে না। আল্লাহই ওরে দ্যাখব।’

মেয়েটির স্বামী, বাড়িওয়ালা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ভাড়া বাড়িতে গণধর্ষণের শিকার হন ১৮ বছরে ওই তরুণী। গণধর্ষণের ঘটনায় চার যুবক জড়িত। এর মধ্যে মোক্তার নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার যুবক স্থানীয় শুক্কুর আলীর ছেলে।

ধর্ষণের শিকার তরুণীর স্বামী (২৫) প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর আগে ২০১৬ সালের এপ্রিলে ভালোবেসে তাঁরা বিয়ে করেন। বরিশালের দুই পাশাপাশি গ্রামে তাঁদের বাড়ি। একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আর স্ত্রী পড়েছেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। তাঁর শ্বশুর মারা যাওয়ার পর শাশুড়ি আবার বিয়ে করেন। সেখানে মা, সৎবাবা ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকতেন তাঁর স্ত্রী। দুই পরিবার তাঁদের বিয়ে মেনে না নেওয়ায় তাঁরা বাড়ি ছেড়ে শুরুতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে এসে ওঠেন। সেখানে একটি এমব্রয়ডারির কারখানায় কাজ নেন দুজনে। কয়েক মাস পর তাঁরা চলে আসেন ঢাকার রামপুরায়। সেখানে তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ নেন। এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তিনি একটি টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানে এবং স্ত্রী বোতল কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন। যে বাড়িতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, অল্প কিছুদিন আগে সেটা তাঁরা ভাড়া নেন। গত ২৭ জানুয়ারি ওই বাড়ির দুটি কক্ষ ভাড়া নেন এক হাজার টাকায়। ঘটনার দিন তাঁরা দুপুরের খাবার খেতে বাসায় আসেন। শরীর খারাপ লাগায় স্ত্রী কারখানায় যাননি। তিনি বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মূল প্রবেশদ্বারে তালা মেরে যান। রাত আটটায় বাড়ি ফিরে দেখেন স্ত্রী কক্ষে হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় অচেতন পড়ে আছেন। ওই রাতেই স্ত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে নিয়ে ভর্তি করান।

মেয়েটি বলেন, সন্ধ্যা সাতটার দিকে তিনি রান্নাঘর থেকে কাজ শেষে বের হওয়ার পর হঠাৎ দেখতে পান চার যুবক তাঁর সামনে। তিনি ওই চারজনকে চিনতেনও না। তবে এখন তাঁর সামনে হাজির করলে শনাক্ত করতে পারবেন।
তাঁদের বাড়ির মালিক বলেন, ঘটনার পর প্রতিবেশীদের সহায়তায় ধর্ষকদের পরিচয় জানতে পেরেছেন। ওই এলাকায় দু-একটি বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে। চার ধর্ষকের সঙ্গে সহায়তাকারী আরও দুই-তিনজন ছিলেন। একতলা পর্যন্ত বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। মূল দরজায় তালা ছিল। বাড়ির প্রাচীর ১০ ফুট উঁচু। মেয়েটি একা আছে জানতে পেরে ধর্ষকেরা পাশের বাড়ির আমগাছ বেয়ে এই বাড়িতে ঢোকেন। ধর্ষকেরা এলাকায় বিভিন্ন ধরনের নেশা করাসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে তিনি শুনেছেন। ঘটনার দিনও তাঁরা বাড়িটির পাশে বসে নেশা করছিলেন। ধর্ষণের ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়েছে বলে তিনি জানান।

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় ইতিমধ্যে মোক্তার নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ধর্ষণের কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মোক্তারের কাছ থেকে আরও দুই-তিনজনের নাম পাওয়া গেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রূপগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সফিউল আজম প্রথম আলোকে বলেন, মোক্তারের সঙ্গে কাদির ও খোকন নামে আরও দুই ধর্ষকের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারেও অভিযান চালানো হবে। মেয়েটি আরও একজন ধর্ষক থাকার (বোতল কারখানার ড্রাইভার সোহাগ) কথা বলছেন এবং সামনে হাজির করলে শনাক্ত করতে পারবেন জানালে এসআই বলেন, ‘তিনি মোক্তার ছাড়া আর কারও নাম জানেন না। অন্যদের তিনি শনাক্ত করতে পারলে আমাদের জন্য সুবিধা হয়। যাদের নাম এসেছে, তাদের গ্রেপ্তারের পর তাঁর সামনে হাজির করা হবে।’

মেয়েটির শারীরিক অবস্থা এখন কিছুটা ভালো বলে জানান ওসিসির সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, কাল (রোববার) তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।

কাল হাসপাতাল ছাড়তে হতে পারে শুনে মেয়েটি আকুতি নিয়ে বললেন, ‘ওকে (স্বামী) জিজ্ঞেস করবেন আমাকে নিয়ে কী ভাবছে। এত দিন পর্যন্ত আমার সব কষ্টে ও পাশে ছিল। এখনো যেন থাকে, এই অনুরোধটুকু করবেন।’

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT