English Version

জাতীয় সংসদে ৪ বছর : বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি জাপা

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ


আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছরেও বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। সরকারের সাজানো বিরোধী দল হিসেবে বরং সরকারেই আবদ্ধ রয়েছে দলটি। দলটির তিন জন এমপি রয়েছেন সরকারের মন্ত্রিসভায়। এ ছাড়া দলীয়প্রধান এইচ এম এরশাদও মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে সুবিধা ভোগ করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এমনকি জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মতে, গত চার বছরে সরকারের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারের লেজুড়বৃত্তি ছাড়া জাতীয় পার্টির দৃশ্যমান কোনো কিছু ছিল না। বিরোধী দল হিসেবে তারা কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এমনকি সংসদের কোনো বিলে ‘না’ ভোট দেয়ারও ইতিহাস জাতীয় পার্টির নেই।

বিএনপির বর্জনের মধ্যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় বিজয়ী হন। এরপর ভোট শেষে ৩৫০ আসনের সংসদে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা ২৭৬। আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোট শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সাতটি, জাসদের ছয়টি, তরীকত ফেডারেশনের দুটি আসন রয়েছে সংসদে। জাতীয় পার্টি ৪০, জাতীয় পার্টি (জেপি) দুটি এবং বিএনএফের একজন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র সদস্যরা ১৬টি আসনে জয়ী হন, যার প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের নেতা। সংসদ বসার আগেই গঠিত সরকারে ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা দল জাতীয় পার্টি ও জেপি যোগ দেয়।

আওয়ামী লীগের বাইরে সব চেয়ে বেশি ৪০টি আসন পাওয়ায় জাতীয় পার্টিকে প্রধান বিরোধী দল ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে জাতীয় সংসদ। সংসদে প্রধান বিরোধী দল হলেও সরকারে অংশীদারিত্ব রয়েছে তাদের। দলের তিনজন এমপি মন্ত্রিসভার সদস্য। দলটির প্রধান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেই মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গা মন্ত্রিসভার সদস্য হন।

সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধিতে বিরোধী দলের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, সংসদে সরকারের বাইরে যে সর্ববৃহৎ দল সরকারের বিরোধিতা করবে, সেটিই বিরোধী দল। কিন্তু জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ হওয়ায় সরকারের কোনো কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করতে পারেনি। এজন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন ভাগাভাগির নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে মন্ত্রীসভায় স্থান দেয়ায় প্রকৃত অর্থে দশম জাতীয় সংসদে কোনো বিরোধী দল নেই। তাছাড়া বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংঘর্ষিক। গত চার বছরে সংসদে জাতীয় পার্টি একটিও ‘না ভোট’ দেয়নি। তাই বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ।

বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে জাতীয় সংসদেও অনির্ধারিত বিতর্ক হয়েছে। সাংসদ ডা. রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, বর্তমানে যে সরকার আছে সেটা কি মহাজোট নাকি জাতীয় না ঐকমত্যের সরকার? বিরোধী দলে থাকলে সরকারে থাকা যায় না। সরকারে থাকলে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা যায় না। বর্তমানে যারা বিরোধী দল তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সংসদে বিল এলে তারা বিপদে পড়বেন। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তখন তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারবেন না। তিনি আরো বলেন, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র সদস্যরা মিলে আমরা যদি সঠিকভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারতাম তাহলে এই সংসদ আরো অর্থবহ ও কার্যকর হতো।

এর জবাবে জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সংবিধানে কোথায় আছে, বিরোধী দল থেকে মন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ দেখিয়ে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিল এলে জাতীয় পার্টি কী করবে তা তখন দেখা যাবে। তিনি ইসরাইল, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানেও বিরোধী দল থেকে মন্ত্রী করা হয়।

অন্যদিকে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে সরকারি দল। এমনকি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতে, বর্তমান বিরোধীদলের ইতিবাচক ভূমিকায় সংসদে এখন একটা পরিবর্তন এসেছে। তারা সরকারের সমালোচনা করছে; পাশাপাশি ভালো কাজের প্রশংসাও করছে। বিরোধীদলের কারণে দশম সংসদে কোরাম সঙ্কট হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতে, জাতীয় পার্টি দশম সংসদে নামে বিরোধী দল হিসেবে থাকলেও সেই দায়িত্ব তারা পালন করতে পারছে না। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিরোধী দল বলতে যা বোঝায় এ সংসদে তা নেই। সংসদে সরকারি দল রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের মতে, সরকারে জাতীয় পার্টির একজন মন্ত্রী আর দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকায় বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির হাত-পা বাঁধা। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে সাংবিধান কার্যক্রম চালানোর জন্য একটা বিরোধী দল দরকার। সেজন্য জাতীয় পার্টি কাগজ-কলমে আছে।

প্রসঙ্গত, প্রথম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল খুব ক্ষীণ আকারে ছিল। তবে এরপর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ জাতীয় সংসদের মেয়াদকালের আধা-গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীন বিরোধী দল ফলপ্রসূ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সফলতার পর ৫ম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বিএনপির নেতৃত্বে এক দলীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে আর বিরোধীদলের স্বীকৃতি পায় ফ্রিডম পার্টি। সপ্তম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে আর বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। অষ্টম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ছিল আওয়ামী লীগ। নবম সংসদে ফের বিরোধীদলের আসনে বসে বিএনপি। দশম জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT