English Version

বিয়েটাই সব নয়…

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ


রিতার জন্য একদিকে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে তার ওপর খুব রাগও হচ্ছে। এত বোকা কেন মেয়েটা? কয়েকজন মানুষ তাকে পছন্দ করল না বলে যে নিজের জীবন দিয়ে দেয়, তাকে বোকা ছাড়া আর কী বলব?

পাঠকেরা কি রিতাকে চিনতে পারছেন? রিতার পুরো নাম রিতা চক্রবর্তী। বাড়ি পিরোজপুরের সদর উপজেলার শিকদার মল্লিক গ্রামে। গায়ের রংটি একটু চাপা ছিল রিতার আর উচ্চতাও ছিল একটু কম। তাই বিয়ের পাত্রী হিসেবে তাঁকে পছন্দ হচ্ছিল না অনেকের। পাত্রপক্ষ তাকে দেখে দেখে যায়। কিন্তু বিয়ে আর হয় না রিতার। শেষমেশ এক জায়গায় তার বিয়ে ঠিক হয় ঠিকই কিন্তু বরপক্ষ শেষ পর্যন্ত বিয়েটি ভেঙে দেয়। চরম হতাশা দেখা দেয় রিতার মনে। ফলাফল গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা। মঙ্গলবার প্রথম আলোয় রিতার এই দুঃখজনক পরিণতির খবরটি ছাপা হয়।

আহারে, বোকা মেয়েটা কেন বুঝল না বিয়ে হওয়াটাই এই জীবনের সবকিছু নয়? বিয়ে করা ছাড়াও মানুষের আরও অনেক কাজ আছে। সেসব কাজের মধ্যে মানুষ সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
হ্যাঁ, রিতা ভুল করেছে। কিন্তু তাঁর এই মৃত্যুর জন্য তিনি মোটেও দায়ী নন। আসলে আমাদের সমাজব্যবস্থাই রিতাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, রিতা পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিলেন। বয়স হয়েছিল ২১ বছর। গ্রামাঞ্চলে যেখানে বেশির ভাগ মেয়ের বয়স ১৮ বছর না হতেই বিয়ে হয়ে যায়, সেখানে ২১ বছর তো বিয়ে জন্য বড্ড বেশি বয়স। তার ওপর কালো আর খাটো হলে তো কোনো কথাই নেই। এমন মেয়ে যে বিয়ের পাত্রী হিসেবে খুব একটা ভালো নয় তা আমাদের সমাজে কে না জানে? তাই তো রিতার মা-বাবা ব্যস্ত হয়ে পড়েন মেয়েকে বিয়ে দিতে। কিন্তু বারবার পাত্রপক্ষের প্রত্যাখ্যান রিতাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বারবার পাত্রপক্ষ প্রত্যাখ্যান করায় নিশ্চয়ই রিতাকে পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে। হয়তো মা-বাবাও তাঁকে ছাড় দেননি তাঁকে। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার দায় তাঁর ওপর চাপিয়েছিলেন।

রিতা তো ভালোভাবে পড়ালেখা করছিলেন। তাঁর মা-বাবা যদি তাঁর বিয়ের চেষ্টা না করতেন, তাহলে আজ রিতা বেঁচে থাকতেন। বারবার যখন পাত্রপক্ষ ফিরে যাচ্ছিল, তখন রিতার মা-বাবার উচিত ছিল মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে তাঁকে পড়ালেখায় উৎসাহিত করা। আর তাঁদেরই বা আর কী দোষ দেব, হয়তো সমাজের চাপে পড়ে তাঁরা সেটা করতে পারেননি।
হায় রে সমাজ! আচ্ছা, সমাজ জিনিসটা আসলে কী? মানুষকে নিয়েই তো সমাজ গড়ে ওঠে। তার মানে মানুষই সমস্যা। একটি মেয়ের বিয়ে না হলে কেন মানুষ এত কথা বলে? কেন সেই মেয়ের মা-বাবাকে নানা কথা শুনতে হয়? কেন তাঁদের হেনস্তা হতে হয়? শুধু গ্রামীণ সমাজে নয়, শহুরে সমাজেও এমনটা ঘটছে আকছার।

গায়ের রং কালো হলে আমাদের সমাজে একজন মেয়েকে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হয়, তা বোধ হয় খুব কম দেশেই দেখা যায়। সে হয়তো পড়ালেখায় ভালো, তার হয়তো আরও অনেক ভালো গুণ রয়েছে। কিন্তু গায়ের কালো রং তার সেসব গুণকে ঢেকে দেয়। বিয়ের বাজারে তার কোনো দাম নেই। আর যদিও বা বিয়ে হয় দেখা যায়, গায়ের কালো রঙের জন্য পাত্রপক্ষকে যৌতুক দিতে হচ্ছে অনেক বেশি।

এমন সমাজ আর এমন মানুষদের পাত্তা দেওয়ার কী আছে? এদের কথায় যদি কেউ আত্মহত্যা করে, তাহলে তো এই দুষ্ট সমাজের দুষ্ট মানুষদেরই জয় হলো। এদের জয়ী হতে দেওয়া যাবে না। মেয়েদের উচিত তাদের কথাকে গায়ে না মেখে নিজের লক্ষ্যপূরণে এগিয়ে যাওয়া; পড়ালেখা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল ২০১৬ সালে ঘটা ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের একটি ঘটনার কথা। গায়ের রং কালো বলে এক তরুণীকে বিয়ের শর্ত হিসেবে বরপক্ষের পরিবার বড় অঙ্কের যৌতুক দাবি করেছিল। কিন্তু জ্যোতি চৌধুরী নামের ওই তরুণী ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়ে দেন, তিনি ওই পাত্রকে বিয়ে করবেন না। গায়ের কালো রঙের জন্য তিনি কাউকে টাকা দেবেন না।

আসুন, আমরা সবাই জ্যোতি চৌধুরীকে অনুসরণ করি। যারা কালো রঙের নিন্দা করেন, তাদের আমরা প্রত্যাখ্যান করি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি ।এটাই আসল কথা। একবার নিজের পায়ে দাঁড়ালে তখন বিয়ের জন্য কিংবা গায়ের রঙের জন্য আলাদা করে ভাবতে হবে না।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT