English Version

অন্তঃসত্ত্বাদের ভরসা রহিমা আপা

প্রকাশিতঃ ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭, ২:১৮ অপরাহ্ণ


ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার চরনিখলা মহল্লার হাসিনা বেগমের ছেলের বয়স আট মাস। এটাই তাঁর প্রথম সন্তান। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে তাঁর মনে ছিল এক অজানা আশঙ্কা। প্রসবের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই তাঁর দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। তখন মহল্লার ‘রহিমা আপা’ এগিয়ে আসেন। তাঁর সহায়তায় নিরাপদে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।

হাসিনা বলেন, ‘প্রথমবার মা হওয়ার সময় প্রত্যেক নারী শঙ্কায় থাকেন। কিন্তু রহিমা আপার মতো একজনের সহায়তা পেলে কোনো শঙ্কাই আর থাকে না।’

একই মহল্লার গৃহবধূ হনুফা বেগমের দুই মাস আগে সন্তান হয়েছে। তিনি বলেন, ‘রহিমা আপার সহায়তায় সুস্থ সন্তান জন্ম হয়েছে। আপদ-বিপদ, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও তিনি ছুটে আসেন। তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য যেন এক আশীর্বাদ।’

রহিমা খাতুনের (৬২) বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চরনিখলা মহল্লায়। তিনি প্রশিক্ষিত ধাত্রী। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি মহল্লার নারীদের সন্তান প্রসবে সহায়তা করেন। এ জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেন না। এমনকি এ কাজের জন্য তিনি কোনো উপহারও নিতে চান না। নিতান্তই বাধ্য হয়ে যদি শাড়ি-কাপড় উপহার নিতে হয়, পরে তিনি তা মহল্লার দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন। সংগ্রামী জীবন ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর রহিমা খাতুনকে ‘জয়িতা’ সম্মাননা দিয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তিনি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও। ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর। টানা দুবার ওই পদে নির্বাচিত হয়েছেন।

সম্প্রতি চরনিখলা মহল্লায় গিয়ে দেখা যায়, নানা বয়সী শিশুরা রহিমাকে জেডি, চাচি, নানি, ফুপাম্মা বলে ডাকছে। রহিমার সঙ্গে তাদের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। সন্তান জন্মের সময় সহায়তা করার কারণে শিশুদের পরিবারের সঙ্গে রহিমার আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠেছে। মহল্লার ২০-২৫ জন গৃহবধূর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্তান জন্মের সময় তাঁদের প্রত্যেকের পাশে ছিলেন রহিমা।

রহিমা খাতুনের ছোট বসতঘরটি দোচালাবিশিষ্ট। ঘরের মেঝে কাঁচা ও স্যাঁতসেঁতে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় দুপাশে জীর্ণ দুটি ছোট খাট। এক পাশে একটি শোকেস। এর ভেতরে কাচের কিছু তৈজসপত্র ও কাপড় রয়েছে। ছেলেকে নিয়ে তিনি থাকেন। ছেলে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের ল্যাবে চাকরি করেন। স্বামী মারা গেছেন। দুই মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একটি বেসরকারি সংস্থায় রহিমা খাতুন ধাত্রিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নেন। পরে ওই সংস্থায় সাত বছর চাকরি করেন। একপর্যায়ে সংস্থাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি নিজের এলাকায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সহায়তা করতে থাকেন। এখনো তিনি সেই কাজ করে চলেছেন। রহিমা খাতুন বলেন, ‘সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সুষম খাবার খেতে বলি। শারীরিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে তাঁদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সন্তান প্রসবে সহায়তা করি। কোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রসূতিকে সরাসরি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

রহিমা খাতুনের প্রয়াত স্বামী আবুল কাশেম পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রহিমাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। টানা দুবার তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সব সময় মানুষের জন্য কাজ করেছি। বড় পরিসরে সেবা করার মানসিকতা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছি। মহল্লার লোকজনই আমার মনোনয়নপত্র জমা দেন, প্রচারণা চালান।’

কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও আগের মতোই সাদাসিধা জীবন যাপন করেন রহিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার তো টাকাপয়সার কোনো প্রয়োজন নেই। নবজাতকের মুখ দেখে অনেকে আমাকে টাকা দিতে চান। দামি কাপড় ও গয়না দিতে চান। আমি তা নেই না। কাউন্সিলর পদের যে সম্মানী ভাতা পাই, তা দিয়েই সংসার চলে যায়।’

ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবদুস ছাত্তার বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর নানা কারণে জনপ্রতিনিধিদের জনপ্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু রহিমার বেলায় উল্টো হয়েছে। নির্লোভ কর্মতৎপরতা রহিমাকে এক অন্য রকম উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সেবায় তিনি নিবেদিতপ্রাণ। আবার কাউন্সিলর হিসেবে এলাকার উন্নয়নের দিকেও নজর রয়েছে তাঁর।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিতু মরিয়ম বলেন, এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনের ক্ষেত্রে রহিমা খাতুনের মতো নারীদের বিশাল অবদান রয়েছে। রহিমার কাজ ও তাঁর সংগ্রামী জীবন সমাজে নজির স্থাপন করছেন।

প্রকাশকঃ
মোঃ মামুনুর হাসান (টিপু)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক:
খন্দকার আমিনুর রহমান

৫০/এফ, ইনার সার্কুলার, (ভি আই পি) রোড- নয়া পল্টন ,ঢাকা- ১০০০।
ফোন: ০২-৯৩৩১৩৯৪, ৯৩৩১৩৯৫, নিউজ রুমঃ ০১৫৩৫৭৭৩৩১৪
ই-মেইল: khoborprotidin24.com@gmail.com, khoborprotidin24news@gmail.com

.::Developed by::.
Great IT